বিএডিসি ডিলারশিপে চরম জালিয়াতি একই ব্যক্তির চারটি লাইসেন্স
রাজশাহী ব্যুরো: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)–এর ডিলারশিপ ব্যবস্থায় নিয়ম বহির্ভুত, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ৪নং মৌগাছী ইউনিয়নের আকুবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুলতান হোসেন একই পরিবার থেকে একাধিক লাইসেন্স নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও চারটি ডিলার লাইসেন্স ব্যবহারের সত্যতা পাওয়া গেছে।
কিন্তু তদন্তে উঠে এসেছে সুলতান হোসেন নিজের নামে এস এম হাবিব ট্রেডার্স, যার লাইসেন্স নং- ৪৮৮/২৬-৭-২০১২। স্ত্রীর নামে মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স, যার লাইসেন্স নং- ৪৮৯/২৬-৭-২০১২। ভাইয়ের নামে মেসার্স সুমাইয়া ট্রেডার্স, যার লাইসেন্স নং- ৪৯০/২৬-৭-২০১২ এবং বন্ধুর নামে মীম এন্টারপ্রাইজ, যার লাইসেন্স নং- ৩৮৭/২১-৯-২০১০ নামের চারটি লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসছেন। এই চারটি লাইসেন্সের সার একই গুদামে মজুত করে কৃত্তিম সংকট তৈরি করেন। যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন সরকারের নির্ধারিত মূল্যে সার না দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করে আসছেন এই সুলতান হোসেন। সরকারি রেট অনুযায়ী কৃষকরা প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও সুলতান সেখানে তিনগুন টাকার নিচে সার দিচ্ছেন না। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে একজন কৃষক রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, উপজেলা কৃষি অফিসার সব জেনেও সুলতানকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং অতিরিক্ত সার বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও পুরনো সরকারের ভূমিকা যেন এখনও স্পষ্ট।
স্থানীয়রা বলছেন, সুলতান হোসেন ২০১০ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ডিলারশিপ কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন নামে লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি সমান্তরাল সার ব্যবসা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। বিএডিসির ডিলারশিপে এমন অনিয়ম রাজশাহীর প্রতিটি উপজেলাতেও আছে বলে জানা গেছে।
বিএডিসি সার বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুলফিকার আলী জানিয়েছেন, আমাদের কাছে মৌখিকভাবে এমন অভিযোগ একাধিক এসেছে। ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারভুক্ত, তাই এ বিষয়ে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারি না। আমাদের লাইসেন্স অনুযায়ী সার দিতে হবে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন, তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নিবেন।
উল্লেখ্য, বিএডিসির সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫ এ স্পষ্টভাবে বলা আছে “একই পরিবার বা একই উপকারভোগীর নামে একাধিক ডিলারশিপ অনুমোদন দেওয়া যাবে না। এছাড়া প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য আলাদা গুদাম (হোডাউন) থাকা বাধ্যতামূলক”। শুধু তাই নয়, নীতিমালায় সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, “সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ডিলার হতে পারবেন না”।
জেলা প্রশাসকের দপ্তরে কৃষকদের দেওয়া সেই অভিযোগে বলা হয়েছে, শুধু সুলতান হোসেন নয়, এই অপরাধ প্রশ্রয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তার হাত রয়েছে বলে তুলে ধরা হয়েছে। নীতিমালা অমান্য, বাজার কারসাজি, কৃত্রিম সংকট তৈরি, ওজনে কারচুপি, সরকারি নির্দেশ অমান্য এগুলো কৃষি কর্মকর্তার মনিটরিং করার কথা থাকলেও তিনি সুলতানকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। কৃষকরা দ্রুত তদন্ত করে লাইসেন্স বাতিল ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এব্যাপারে জেলা প্রশাসক রাজশাহীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। তাই তার বক্তব্য ও মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে ডিলারশিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু কৃষক নয়, পুরো খাদ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেবে এখন তা দেখার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন
Array