স্মৃতিতে১৫ই আগষ্ট’ ৭৫, আবু সাঈদ তালুকদার বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ তাজউদ্দিন আহমদের ভাগ্নে

মো: ইব্রাহিম হোসেন, ষ্টাফ রিপোর্টার: সেই দিন ছিল ১৫ই আগষ্ট, ১৯৭৫ইং শুক্রবার সকাল সম্ভবত ৪টা থেকে সাড়ে চারটা মর্টারএলএমজি, এসএমজি, এসএলআর এর ব্রাস ফায়ারে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরহয়ে রাস্তায় গেলাম। পাশের বাসার লোকজনও বের হয়ে রাস্তায় এসেছে, তখনও থেমে থেমেগুলি হচ্ছে। মর্টারেরও গুলি হচ্ছে।

কোথায় গুলি হচ্ছে বুঝতে পারিনি। পাশের বাসারভদ্রলোক বলেছেন আজ ভারতের স্বাধীনতা দিবস তাই হয়তো গুলি করে আনন্দ প্রকাশ করছে। খুবকাছে থেকে গুলির আওয়াজ আসছে। তাই সবাইকে ঘরে যেতে বলে আমিও ঘরে ঢুকে গেলাম।মোহাম্মপুরের রাজিয়া সুলতানা রোডের উত্তর দিকে আমার বাসা।

সকালেরেডিও শোনা আমার একটা অন্যতম অভ্যাস তাই আমার সেই পুরনো রেডিওটা চালু করে ঢাকাবেতার কেন্দ্র ধরা মাত্র শুনতে পেলাম “আমি মেজর ডালিম বলছি” শেখ মুজিবকে হত্যা করাহয়েছে। আমি আবাক বিস্মিত স্তম্ভিত কিংকর্তব্যবিমূঢ় নির্বাক হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরঘোষণা করা হল, রেডিও বাংলাদেশ থেকে খন্দকার মোশতাক ভাষণ দিবেন।

খন্দকার মোশতাকেরভাষনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পরে তিনি যা বলেছেন তা হলো জাতির বিশেষ প্রয়োজনে শেখমুজিবকে হত্যা করা হলো, ঢাকায় কার্ফু জারি করা হল খন্দকার মোশতাক নিজেকেরাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন। জনগণকে রাস্তায় বের হতে বারন করলেন। সারাশহর শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাস্তাঘাট জনমানব শূণ্য। আমি লুঙ্গি পড়েই ছুটে চললাম।

উদ্দেশ্য ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোডে ৭৫১নং বাড়িতে। সেখানে থাকেন মুক্তিযুদ্ধকালীনস্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও সেচ্ছায় পদত্যাগকারী অর্থমন্ত্রীতাজউদ্দিন আহম্মদ। খুনীরা রেডিও ঘোষনায় কার্ফু জারি করেছে। রাস্তাঘাট একেবারেফাঁকা। লোকজন রিকশা গাড়ী কোনকিছুই রাস্তায় বের হয়নি। আমি হেঁটেই আবাহনী মাঠেরকাছেই তাজউদ্দিন আহমদের বাসায় পৌছাই।

বাসার সামনে যেতেই দেখা হল বাসার কেয়ার টেকারহাইয়ের বাবার (শুক্কুর আলী) সাথে। জিজ্ঞাসা করলাম খবর পেয়েছেন? জবাব দিলেন হ্যাঁ,আমি বললাম, মামা কোথায়? (মামা মানে তাজউদ্দিন আহম্মদ) হাইয়ের বাবা বললেন ভাইসাহেবকে আমি ঘুম থেকে উঠিয়েছি এবং উনাকে খবর বলেছি। আমি বাসার ভিতর চলে গেলাম সোজাদু’তলার ড্রইং রুমে। সেখানে মামাকে টেলিফোনে কথা বলতে দেখলাম। ফোনের পর ফোন আসছে।

আমি চুপ করে সোফায় বসে থাকলাম টেলিফোনের কথা শেষ করে যখন সোফায় বসেন, তখন অনেকচিন্তিত মনে হচ্ছিল। কিছু নেতৃস্থানীয় লোক এসে বলছেন আপনি আত্মগোপন করেন। তিনিতাদের কথার কোনো জাবাব দেননি। প্রথম দিকে মানে সকাল আটটার দিকে প্রচুর টেলিফোনআসছিল। ধীরে ধীরে ঘড়ির কাটায় সময় বাড়ছে আর ফোন আসা কমে যাচ্ছে। ফোনে তিনি কোনমন্তব্য করেননি। শুধু শুনে যাচ্ছেন। একসময় মামী নাস্তা খেতে বলেন। তখন প্রায় নয়টাবাজে আমাকেও নাস্তা করতে বলছেন।

নাস্তারটেবিলে আমরা দুইজন। মামী একটু অন্যরুমে গেছেন, এই ফাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনিনিজেকে নিরাপদ মনে করেন। “তিনি জবাব দিলেন ক্ষমতায় কে আছে জানিনা”। আমি আর চুপথাকতে পারলাম না, বলেই ফেললাম ক্ষমতায় খন্দকার মোশতাক, রেডিওতে বারবার তার নামপ্রচার করছে। তিনি বললেন ক্ষমতা তার কাছে না, আর্মির কে ক্ষমতায় তা জানতে পারিনি,তবে তিনি বলেছিলেন খালেদ মোশাররফ ক্ষমতায় থাকলে তিনি নিরাপদ।নাস্তারটেবিল ছেড়ে আবার ড্রইংরুমে বসলাম।

তাঁকে অত্যন্ত চিন্তিত মনে হচ্ছিল। হঠাৎ তিনিআমাকে বললেন মেজ মামা (মফিজ উদ্দিন) তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন তাঁর খোঁজ নিয়ে আসতে।আমি ধানমন্ডিতে মেজ মামার বাসায় চলে গেলাম। আমাকে দেখে বকাঝকা শুরু করে দিলেন কেনতুমি কার্ফুও মধ্যে বের হয়েছো। বললাম বড়মামা আমাকে আপনার শরীরের খোঁজ নিতেপাঠিয়েছেন। মেজ মামা আমাকে বললেন- আমি ভাল আছি, তুমি বাসায় যাও। আমি যেয়ে বললামমেজ মামা ভালো আছে।

তিনি পুনরায় আমাকে শেখ ফজলুল হক মনি (মনি ভাইয়ের) খবর নিতেবলেছেন। আমি মামার কাছ থেকে আসতে আসতে ভাবলাম তিনি আর আমাকে ঊনার কাছে থাকতে দিতেচাননি। তাই আমাকে এদিক ওদিক পাঠাচ্ছেন। পরে জানতে পারলাম আমি চলে আসার কিছুক্ষণপরেই তাজউদ্দিন আহম্মদের বাড়িটা আর্মি ঘিরে ফেলেছে। তাঁকে গৃহবন্দি করে রেখেছে।

আমি ওখানে থাকলে আমিও আটকা পড়ে যেতাম।আজকেভাবতে অবাক লাগে তিনি কত তীক্ষèবুদ্ধি সম্পন্ন লোক ছিলেন। কিভাবে আমাকে বাসা থেকেসরিয়ে দিলেন। নীচে এসে আমগাছের তলায় ছাত্রনেতা ফজলুর রাহমান মোল্লা মুক্তিযোদ্ধা(ফজলু) ভাইয়ের সাথে দেখা হল। আমি ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড ধরে মনি ভাইয়ের বাসারদিকে এগিয়ে চলছি একাকী, হঠাৎ মেজ মামার কথা মনে পড়ে গেল, কার্ফুর মধ্যে বাহিরেঘুরছো।

তখন অন্যপথ ধরে বাসার দিকে রওনা দিলাম। নীরব নিস্তব্ধ শহরে গলিপথ ধরে পায়েহেঁটে দুঃখভারাক্রান্ত মনে বাসার দিকে আসছি। দু’একটা কাকের ডাক ছাড়া অন্যকোন শব্দকানে ভেসে আসেনি। মনে হলো সারা শহর শোকে নীরব নিস্তব্ধ। দুপুরগড়িয়ে বিকাল তিনটায় আবার ধানমন্ডি তাজউদ্দিন আহম্মদের বাসায় যাই। দেখি বাসার গেইটেআর্মি ও ছাদে স্বশস্ত্র আর্মি মেশিনগান তাক করে বসে আছে। আমি বাসায় ঢুকতে চেষ্টাকরলাম।

আমাকে বাধা দিল ঢুকতে দিলো না। আমি বললাম আমার আত্মীয়ের বাসায় আমি কেনঢুকতে পারব না আমাকে ঢুকতে দিন। এমন সময় দেখি দু’তলা থেকে বাসার কেয়ার টেকার আমাকেহাতে ইশারা করছে যেন আমি চলে যাই। তখন আমি বুঝতে পারছি তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়েছে,তারপর আমি চলে আসি। জীবিততাজউদ্দিনের সাথে আর আমার দেখা হয়নি। তবে জেলখানা থেকে একটা চিঠি পেয়েছিলাম, দেখাহয়েছিল ৪ঠা নভেম্বর গভীর রাতে যখন জেলখানা থেকে তাঁর লাশ নিয়ে এসেছিলাম।

আমি খুবকাছে থেকে সারারাত নিরিবিলিতে একাকীত্বে রাত কাটিয়েছি তাঁর লাশের সাথে। কতকথাবলেছি পাশে বসে, কেউ শুনতে পায়নি। শুধু মনে হচ্ছে আমাদের ব্যর্থতা আমরা কেনবাঁচাতে পারিনি তোমাদেরকে, তার ফল আমরা আজ ভোগ করছি। জাতীরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সারা দেশে আওয়ামীলীগ সহ স্বাধীনতারপক্ষের সকলের উপর নেমে আসে নির্যাতন নিপীড়ন।

আমি ব্যাংকে ছোট একটা চাকুরী করতামআমাকে ১৮ই আগষ্ট/৭৫ বদলী করা হলো। বঙ্গবন্ধু হত্যার তিনদিন পর প্রথম যে দিন অফিসখুলছে সেই দিনই আমার বদলীর আদেশ পাই। যে অফিসার আমাকে বদলি করেছিল তিনি আমাকে গর্বকরে বলেছিলেন, শেখ মুজিব নেই এখন কে ঠেকাবে আমি চিন্তিত ছিলাম না। শেখ শহীদেরশ্বশুর সালেহীন সাহেব ছিলেন জনতা ব্যাংকের এম.ডি।

কিন্তু কিছুদিন পরে এম.ডিকে জিয়াউর রহমান মিথ্যা মামলায় ১০ বছরের সাজা দিয়েদিলো। আমাকে বদলী করা হল রাজশাহীর নওগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমরাভুলোমনা জাতি সবকিছু ভুলে যাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সহ তার পরিবারেরসদস্যদের ঢাকায় প্রকাশ্যে জানাজা পড়তে দেয় নাই পিশাচরা। কোন মানবাধিকার সংগঠন কোনপ্রতিবাদ করেনি।

কোন ইসলাম পন্থিরা কোন কথা বলেনি। কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান এমন কিমিলাদ পড়তে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যারা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীনকরেছে সেই জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় বন্দি অবস্থায় ব্রাস ফায়ারে হত্যা করেছে।টকশো ওয়ালাদের কি সে কথা মনে আছে। সব ভুলতে বসেছে, জেনে না জানার ভান করছে। তাদেরনির্যাতনের ভয়ে ১৫ই আগষ্ট/৭৫ পরবর্তী জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে আওয়ামীলীগ কর্মীসমর্থকরা তাদের পরিচয় গোপন করে রাখত।

একদিন যারা ১৫ই আগষ্টকে নাজাত দিবস পালন করত আজকে তারাই মিথ্যা জন্মদিনপালন করে। তাইমনি ভাইয়ের কথা আজকে বড় মনে পরে তিনি বলতেন, বঙ্গবন্ধু কঠোর হোন। আজকে শোকের মাসেজননেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে ইচ্ছে করেদল এবং প্রশাসন থেকে বিএনপি জামায়াতকে হঠান।

আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দলেরপ্রতি আস্থা সমর্থন বাড়ান। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাচ্ছে। জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুসাঈদ তালুকদার, অবসরপ্রাপ্তব্যাংক কর্মকর্তা, সভাপতি,মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, মোহাম্মদপুর থানা, সহ-সভাপতি,ঢাকা মহানগর (মুসপ) এবং জেলহত্যা মামলার স্বাক্ষী।