সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী: সাধারণ থেকে অসাধারণ

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কান্ডারী।

শরিফুল হাসান, ফরিদপুর থেকে: সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কান্ডারী। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ায় তাঁর রয়েছে বিশেষ অবদান। দুঃসময়ে যিনি ভরাট কণ্ঠের শ্লোগানে আওয়ামী লীগকে পুণরুজ্জীবিত করেছিলেন। যিনি অনেক চড়াই-উৎরাই এর মধ্যেও নৌকার বৈঠা ধরে আছেন। কখনো দলের সঙ্গে, আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরী ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদের উপনেতা নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মত কোনো নারী সংসদ উপনেতা হলেন। তিনি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালণ করেছেন। তিনি-ই দেশের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় সংসদের উপনেতা।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ ফরিদপুরের কৃষাণপুর ইউনিয়ন (ফরিদপুর-২; নগরকান্দা, সালতা ও সদরপুর) থেকে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। দশম সাধারণ নির্বাচনেও তিনি এ অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালের ৮ মে মাগুরা জেলায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ শাহ হামিদ উল্লাহ এবং মা সৈয়দা আছিয়া খাতুন।

শিক্ষাজীবনে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর স্বামী রাজনীতিবিদ এবং সমাজকর্মী গোলাম আকবর চৌধুরী। ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর আকবর চৌধুরী মারা যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে ১৯৫৬ সাল থেকে এক সাধারণ মেয়ে তরুণী সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন।

নিজ মেধা ও যোগ্যতার ফলে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কলকাতা গোবরা নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন সাজেদা চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতাকে তরান্নিত করেছেন এই তারকা রাজনীতিবিদ। ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালক ছিলেন।

১৯৭২-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ গার্ল গাইডের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১১ বছর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর তিনি এবং সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন মিলে আওয়ামী লীগকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। দলের নানা মত পার্থক্যের মধ্যেও কন্যাতুল্য শেখ হাসিনার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য রেখেছেন।

পিতার হত্যার পর নেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ব্যাপারেও তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় অনেক সিনিয়র নেতা ‘বয়সে ছোট’ এই বিবেচনায় আওয়ামী লীগের সভাপতিকে সম্মান দেখাতে কার্পণ্য করতো। এ সময় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ‘নেত্রী’ ডাকা শুরু করেন। নেত্রী তাঁকে ফুফু ডাকলেও প্রকাশ্যে নেত্রীকে নেতার মর্যাদা দেওয়ার চর্চা শুরু করেন তিনিই।

১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রদত্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়কের দায়িত্বও তিনি পালন করছেন। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ১৯৭৪ সালে গ্রামীণ উন্নয়ন ও শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য ইউনেস্কো ফেলোশিপপ্রাপ্ত হন। একই সময় তিনি বাংলাদেশ গার্ল-গাইড এসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক সনদ সিলভার এলিফ্যান্ট পদক লাভ করেন।

তিনি ২০০০ সালে আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক ওমেন অব দি ইয়ার নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। নিজের নিস্বার্থ অবদানের কারণে ফরিদপুরে নিজ এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এলাকাবাসীর দাবির মুখে এবার তিনি নির্বাচন করছেন। ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা, সালথা উপজেলা ও সদরপুরের কৃঞ্চপুর ইউনিয়ন) নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৩ জন ভোটার ১২৩ টি কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। নির্বাচনী আসন জুড়ে চলছে ভোটের ইমেজ।

জোরেশোরে চলছে প্রার্থীদের প্রচারণা। উঠান বৈঠক, পথসভা, ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে প্রার্থী ও তার সমর্থকরা চালাচ্ছে নিজ নিজ প্রচারণা। ভোটারেরাও বাজারে চায়ের দোকানে, রাস্তায়, মাঠে সর্বক্ষেত্রে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চলেছেন। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী অসুস্থ থাকার কারণে মাঠে না থাকলেও আওয়ামী লীগের উন্নয়নের বার্তা নিয়ে তৃর্ণমূল নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তার রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও ছোট ছেলে শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী।