রোদেলা বিকেলের প্রদীপ্ত। প্রিন্স ইসলাম


প্রিন্স ইসলাম: রোদেলা নিজ হাতে ধারালো ছুরি দিয়ে প্রদীপ্তের বুক চিড়ে হৃদয় বের করে নিয়ে আসল! রোদেলা চিৎকার করে বলে উঠল, যে হৃদয় দিয়ে তুই ভালবাসার অনুভূতি নিতে চাস সে হৃদয় আমি টুকরো টুকরো করে দিলাম”। পুরো স্বপ্নটা শেষ হবার আগেই রোদেলার মুখে বলা স্বপ্নের এ দৃশ্যটি দেখার পরই প্রদীপ্তের দুঃস্বপ্নটা ভেঙ্গে গেল!! প্রদীপ্ত বুঝতে পারল, সে কেন এমন স্বপ্ন দেখল রোদেলাকে নিয়ে? দীর্ঘ সাত বছর পর প্রদীপ্ত বাংলাদেশে এসেছে। তার সাদা গাড়ীটি জগন্নাথ ভার্সিটির কাছে পাশে এসে দাড়াল।

হঠাৎ গাড়ীর ব্রেক করার কারণে প্রদীপ্ত কিছুটা বিরক্ত নিয়ে তার ড়্রাইভারকে বলতে থাকে, তোমার আসলে ড়্রাইভার হওয়া উচিত ছিলনা- প্রদীপ্তের চোখের চশমাটা সরিয়ে দিলো, প্রদীপ্ত চোখে দেখতে পায়না। ছড়ি হাতে গাড়ী হতে বের হয় প্রদীপ্ত। নস্টালজিক হয়ে পড়ে প্রদীপ্ত। চোখে না দেখলেও অনুভব শক্তিকে সাথী করে গোলাপ ফুলের গাছটার পাশে এসে দাঁড়ায়, যেখানে অনেক স্মৃতি মিশে গেছে বহুদুর..

একাকীত্বের বিপর্যস্ত তনুমন প্রদীপ্তকে প্রকৃতির সাথে কথা বলতে শিখিয়েছে, তাই বিড়বিড় করে কিছু একটা বলবার চেষ্টা করতে থাকে। এদিকে বিকেলের আলো ফিঁকে হয়ে আসে, গোধুলীর লালচে আভায় চারিদিক পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুচোখ বেয়ে বারিধারা অঝরে ঝড়তে থাকে প্রদীপ্তের অসাড় চোখ দুটো হতে।

তখন সন্ধ্যার গোধুলী। গোলাপ ফুলের গাছটার পাশে জমে আছে দুঃসহ কিছু স্মৃতিকথা। বটতলার কাছে চলে এল ধীর পদক্ষেপে, কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল সে!

আবারও পুরানো ক্ষতটা জেঁকে ধরল তাকে। খুলে গেল স্মৃতির দুয়ার.. আজ হতে ঠিক দশ বছর আগের সে সময়টি। যেন রুপকথার ফ্রেমে বাধানো সে এক ‘স্মৃতির মহাকাব্য…….ভার্সিটিরই মেধাবী ও অপরুপা সুন্দরী “রোদেলা” যেন রাজকন্যা ক্লিওপেট্রার মত! চোখ ফেরানো দায়, যেমনি তার রুপ, তেমন মেধাবী ছিল মেয়েটি! সে ভার্সিটির মেধাবী গরীব ছাত্র প্রদীপ্ত! কারো সাথে তেমন একটা আড্ডা দিতনা প্রদীপ্ত।

গরীব বলে তাকে এড়িয়ে চলত বেশীরভাগ ছেলে। গরীব বাবা-মায়ের সন্তান বলেই স্বপ্ন না দেখার ইচ্ছাটাকে বুক চাপা দিয়েছে। প্রতিদিন ক্লাস শেষে ঠিক বিকেলে তার দেখা হয় রোদেলার সাথে। চোখাচোখি হয়,কিন্তু কথা হয়না! প্রদীপ্তের বুক থেকে হতাশার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বের হয়!

রোদেলার কাছে কোন ছেলের চোখের চাহনীর কোন মূল্য নেই। তার ইচ্ছা, তার মার পছন্দের পাত্র মুনীমকে বিয়ে করে পা’র ওপর পা তুলে দিন কাটানো। মুনীমের অঢেল টাকা, দেখতে সে হ্যান্ডসাম, ঢাকাতে নিজস্ব ব্যবসা ছাড়াও ইউ এস এ তে ব্যবসা রয়েছে। ও নিজে শিল্পপতি বাবার সন্তান! রোদেলা তার মার আদর্শে প্রতিপালিত। ভালবাসার কোন অনুভূতি তার হৃদয়ে নেই। রোদেলার মা

“মিসেস খান, তারও বহু আগের ইচ্ছা, মুনীমের কাছেই মেয়েকে পাত্রস্থ করার। তিনি চিন্তা করে দেখলেন তাতে বংশের সুনাম অক্ষুন্ন থাকবে। প্রদীপ্ত প্রতিদিন বিকেলে ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে থাকে রোদলোকে একনজর দেখার জন্য। আর ঠিকই প্রতিদিন রোদেলার সাথে সেই গোলাপ ফুলের বাগানে চোখাচোখি হয় সাথে রোদেলার সাথে। যেন রুপ উপচে পড়া রুপের আলোতে আলোকিত রাজকন্যা! শেষাবধি এই চোখাচোখি ধীরে ধীরে ভাললাগার দিকে এগোতে থাকে। রোদেলা বুঝতে পারে তাকে ভালবেসে ফেলেছে প্রদীপ্ত।

মাসের পর মাস এভাবে তার দিকে আঁড় চোখ তাকানো, সামনে এলেই হোচট খেয়ে পড়ে যাওয়া এসব বিষয় প্রচন্ড বিরক্তি আর উপদ্রব হিসেবে মনে করে তাকে দেখা নেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকল রোদেলা!

সেদিন ছিল সোমবার। বিকেলের মিষ্টি আলোতে রোদেলা বসে আছে ফুলের বাগানে। প্রদীপ্ত দুর হতে তার দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে আড়চোখে, সেটা বুঝতে পারারে সাথে সাথে! ইশারায় মিষ্টি হেসে ডাকল তাকে! কালবিলম্ব না করে, একরকম প্রায় দৌড়ে চলে এল রোদেলার সামনে!

আচ্ছা আপনার কি লজ্জ্বা-শরম বলে কিছু কি নেই ? আমাকে আপনি মাসের পর মাস কেন ফলো করছেন, রোদেলা কথাগুলো দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে।

প্রদীপ্ত বলতে লাগল, আসলে, আসলে আমম.মি আমি তোমাকে ..তোমাকে, মনে হয়..। রোদেলা – কি মনে হয়, ভালবেসেছেন? বিয়ে করতে চান?? প্রদীপ্ত মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইল। রোদেলা – চুপ করে না থেকে কিছু একটা বলুন!!! প্রদীপ্ত- জি, হ্যা মানে, ইয়ে মানে ওটাই!!! রোদেলা – আচ্ছা আপনি আমাকে ভালবাসেন তো ভাল কথা! তো কি কি আছে আপনার আমাকে দেবার মত? অঢেল টাকা আছে? ঢাকাতে নিজস্ব ব্যবসা আছে? শিল্পপতি বাবার সন্তান? গাড়ী আছে? নিজের বাড়ী আছে? প্রদীপ্ত বুঝতে পারে সে হেরে যাচ্ছে। আর তাই দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, আমার বুক ভরা ভালবাসা আর সততায় পরিপূর্ণ একটা মন আছে!

রোদেলা – আপনার সাহস দেখে আমি তো অবাক হচ্ছি! আমার প্রতিদিনের খরচ কত জানেন? প্রদীপ্ত- আমি প্রয়োজনে তোমার বিয়ে ঠেকাব। আমি অন্য কিছু চিন্তা করতে পারছিনা.. রাগ সামলে রাখতে পারল না রোদেলা, সাথে সাথে কষে একটা থাপ্পড় দিল প্রদীপ্তকে! ফলে তাল সামলে রাখতে না পেরে বাগানের রেলিং এর লোহার বেরিকেডে হুমরি খেয়ে পড়ল প্রদীপ্ত। আর সাথে সাথে চোখের ভেতর লোহার পাত ঢুকে গেল !!! রক্তে ভরে যাচ্ছে।প্রদীপ্ত ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ল মাটিতে!

তারপর কোন রুপ ভ্রুক্ষেপ না করে চলে গেল রোদেলা। কিছু লোক প্রদীপ্তেকে রাস্তায় পেল ভয়াবহ অবস্থায়!!! রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হল। বড় ধরনের অপারেশন করাতে হবে। ওর মা কান্না করতে করতে হাসপাতালে আসলো । প্রদীপ্তের মা লোকজনের কাছে হাত পাততে থাকল। উপায়ন্তর না দেখে বিধ্বস্ত মা অবশেষে নিজের রক্ত আর কিডনী বিক্রয় করল, ব্যবস্থা হল তার অপারেশনের টাকা। কিন্তু ততক্ষণে প্রদীপ্তের চোখ নষট হয়ে গেল চিরতরে । ভাগ্যের নির্মম কষাঘাতে ভেতর ওর মা নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

এতসব ঘটনার মাঝে আমরা কি ভুলে গেলাম রোদেলাকে? যার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে প্রদীপ্তের জীবনে নেমে এসেছিল অমাবস্যার কাালো আধার! আসলে কি হয়েছিলো রোদেলার? আসুন, সেটা জাানতে আমরা আবারও সাত বছর আগের স্মৃতির পাতা উল্টে দেখি..

লোভী এবং রাজনৈতিক মার প্ররোচনায় রোদেলা বিয়ে করে মুনীমকে। তারপর ইউ এস এ তে চলে আসে কিছুদিন পর। রোদেলা সব পায়!! টাকা, পয়সার রাখার স্থান থাকত না তার। ওর বড়লোক হাসবেন্ড মুনীম বাবার বখে যাওয়া সন্তান যে কিনা, বিকৃত যৌনচারে অভ্যস্ত ছিল। বিকৃত যৌনতাড়নার মেটাতে চাইত সে রোদেলা দিয়ে। তারপর একদিন বন্ধুদের নিয়ে আসল দুরাচার মুনীম । সবাই মিলে রোদেলার সুন্দর দেহটাকে খুবলে খুবলে খেতে থাকে প্রতিদিন। রোদেলাকে ওরা অবশেষে শিকল দিয়ে বেঁধে অত্যাচার শুরু করে। ফলে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে রোদেলা!!! রুপ-যৌবনের ইতি ঘটে। সারা শরীরের অজানা কোন এক ব্যাধি বাসা বাধে।

প্রকৃতি যেন তার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে বব্ধপরিকর!!! তীব্র দৈহিক আর মানসিক কষ্টে নিয়মিত প্যাথিড্রিন নিতে শুরু করল রোদেলা। আধারে নিজেকে আড়াল করে রাখত-শেষ রাতে রোদেলার ডুকরে কেঁদে কেঁদে প্রদীপ্তের নামটা বারবার জপ করতে থাকল!!! পাশের বাড়ির সবাই প্রায়ই শুনতে পেত করুণ স্বরে রোদেলা ডুকরে কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলে, ‘প্রদীপ্ত আমি তোমায় কষ্ট দিয়েছি, তাই আজ আমার এই অবস্থা, তুমি আমায় ক্ষমা কর, ক্ষমা কর !! তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইত। কেউ দেখার থাকত না।

মুনীম মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল এ পাগলী আধাবুড়িটাকে বাঁচিয়ে না রেখে বরং মেরে ফেলাই যুক্তিযুক্ত কাজ করা হবে। নিয়তির কি নিষ্টুর পরিহাসে ছিন্নবস্র পরিহিত, শিকলবাধা রোদেলাকে শামীম ও তার বিকৃত চরিত্রের বন্ধুরা একত্রিত হয়ে গলা টিপে হত্যা করল! গলায় কন্ঠ রুব্ধ হবার পর যতক্ষণ পর্যন্ত রক্তে ভেসে না গেল ততক্ষণ পর্যন্ত চেপে ধরল গলা!! কিন্তু, তাতে নড়াচাড়া করা বন্ধ করল না রোদেলা। ঐ অবস্থাতেই মুনীমের সকল বন্ধুরা মিলে রক্তাক্ত রোদেলাকে আরো কয়েকবার নির্যাতন করার পর ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকল! রোদেলার মর্মভেদী চিৎকার মিশে গেল শেষ রাতের দ্রুত ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে। কেউ শুনল না রোদেলার সে মর্মভেদী চিৎকার…

একসময়ের অহংকারী ও প্রতাপশালী রোদেলার অসহায় সে লাশটি ডোবায় ফেলে দিল ওরা। যদিও বহুদিন পর সে খুনের রহস্য উদঘাটিত হল। ততদিনে সাতটি বছর পেরিয়ে গেছে। প্রদীপ্ত বিদেশ গিয়ে নিজেকে নিজের পায়ে দাঁড় করায়। আস্তে আস্তে সে অনেক অনেক সম্পদের মালিক হয়ে পড়ে যেটি, একরকম মিরাকলও বলা যেতে পারে। সাত বছর পর একদিন সে পা ফেলে দেশের মাটিতে। আর তখনই সে জানতে পারে রোদেলার করুণ মৃত্যু সংবাদ। এরপর আর কোনদিনও কখনও কাউকে ভালবাসেনি প্রদীপ্ত।

আজ প্রদীপ্তেরর দুচোখে কোন আলো নেই। কিন্তু, তার মনে হল ‘আজ তার চোখে আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছে’। এরপর যখনই তার সামনে কোন অপরুপা তার ভূবন আলোকিত রুপ নিয়ে এসে দাড়িয়েছে তার অন্ধত্বের সাথী হতে, ঠিক তখনই তার রক্তাক্ত চোখে ভেসে উঠেছে রোদেলার প্রিয় মুখটি..তাই ভালবাসা আর সংসারের মায়া আর কোনদিনও অনুভব করতে পারেনি সে। হঠাৎ করেই যেন প্রদীপ্তের চোখের আলো ফুটে উঠল! গোলাপ বাগানটার কাছে যেখানে প্রতিদিন রোদলা বসে রইত সেখানে আসতেই রোদেলার শরীরের ঘ্রাণ পেল প্রদীপ্ত। প্রদীপ্ত অনুভর করল, রোদলো ভেসে বেড়াচ্ছে রোদেলা পরীর মত হয়ে গোলাপের বাগানে।

বিকেলে প্রদীপ্ত প্রায় প্রতিদিনই আজো গিয়ে দাড়িয়ে থাকে সেই গোলাপের বাগানে। ঠিক সেই সময় প্রদীপ্ত রোদেলার শরীরের ঘ্রাণ অনুভব করতে পারে, ঠিক সেই সময় সেই স্থানে! রোদেলা বিকেলে দুর আকাশের লালচে গোধুলীর আলোকচ্ছটা আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামছে, প্রদীপ্ত হাটতে শুরু করে অজানা কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যা তার আদৌ জানা নেই।

   ……………………সমাপ্ত……………………………..

যে সমাজের সংস্কার তাকে আকাশ (নগ্ন)সংস্কৃতিকে ব্রেইনে স্থান করে দেয়, পার্কে, হোটেলে গোপনে শিহরণ ছড়িয়ে দেয়, মধ্যরাতে আধুনিকতার টাকা ছড়িয়ে দেবার বারকে বৈধতার চাঁদর পরিয়ে রাখে, বিয়ের পবিত্র বিধানকে যৌতুকের মহামারীতে বিধ্বস্ত করে দেয়, মাষ্টার্স করার পর ছেলেটিকে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসতে পরতে হয় অবৈধ পথের নোংরা খোলস পড়ে, যে সম্পর্ক পড়ে ওঠে টাকার উপর ভিত্তি করে, সে হৃদয় খুঁজে বেড়ায় যৌনতার কামশিহরণ, যে অন্তর খুঁজে বেড়ায় টাকার পাহাড়,দামী বাড়ি,দামী গহণার বাক্স, এলিয়ন গাড়ীর চেক, মদের গেলাসে ইয়াবার নীল জগত সেই সমাজে নিমর্ম পরিণতি এটাই